


ছবিতে হারুণ ও পলি দম্পতির যে সাজানো গোছানো ঘর, গবাদি পশু আর সবজি বাগান দেখা যায়—তা অনেকের চোখে রূপকথার গল্প মনে হলেও এটি একেবারেই বাস্তব। এই পরিবর্তন এমন কিছু, যা শুধু বস্তুগত নয়; মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
এক সময় যাদের জীবনে “নুন আনতে পানতা ফুরোয়” অবস্থা ছিল, তারাই আজ সাক্ষী হয়ে আছেন মানবিক সহায়তার শক্তিশালী প্রভাবের।
২০২০ সালের জুন মাসে নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলার নাদোনা ইউনিয়নের দেবপুর গ্রামে পরিচালিত জীবিকা উন্নয়ন কেন্দ্র–৩ (নাদোনা জীবিকা প্রকল্প)-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত হন হতদরিদ্র দিনমজুর হারুনর রশীদ (৪৪) ও তাঁর স্ত্রী আফরিন আক্তার পলি (৩৮)।
ছোট উদ্যোগ, বড় পরিবর্তন
প্রথমে তাঁদের গবাদি পশু পালনের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর প্রথম ধাপে ছাগল কেনার জন্য দেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা। সেই টাকায় তাঁরা দুটি ছাগল কেনেন। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ছাগল বাচ্চা দেওয়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়টি।
পরবর্তী ধাপে আরও ১০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়ে এবং ছাগল বিক্রির আয় যুক্ত করে তাঁরা একটি গরু কিনতে সক্ষম হন। এখান থেকেই শুরু হয় তাদের আর্থিক স্বাবলম্বীতার যাত্রা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—তারা কখনোই প্রাপ্ত অর্থ অপচয় করেননি; বরং পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ করেছেন।
স্বপ্নের ঘর
এরই মধ্যে প্রকল্পের কর্মকর্তারা তাঁদের জন্য একটি ঘর নির্মাণের প্রস্তাব দেন—যা ছিল দম্পতির কল্পনারও বাইরে।
ঘরের সঙ্গে তৈরি করা হয় স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, রান্নাঘর, দুটি কক্ষ ও সামনের বারান্দা। একের পর এক এমন “অকল্পনীয়” ঘটনা তাদের জীবনে বাস্তবে রূপ নিতে থাকে।
শিক্ষায় নতুন দিগন্ত
যে পরিবার দুই বছর আগেও সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে হিমশিম খেত, আজ সেই পরিবারের বড় ছেলে আনিসুর রহমান পলাশ একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। অপর সন্তানও ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে—যা এই দম্পতির জন্য রূপকথার চেয়েও বড় প্রাপ্তি।
আয়, স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাস
বর্তমানে এই দম্পতির মাসিক আয় প্রায় ২০ হাজার টাকা।
তাঁদের আয়ের উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দুধাল গাভী
- ছাগল পালন
- হাঁস, মুরগি ও কবুতর
- পারিবারিক সবজি বাগান (লাউ, শিম, বরবটি, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি)
এছাড়া নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ায় চিকিৎসা ব্যয় কমেছে, বেড়েছে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সক্ষমতা। স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহার ও নিরাপদ পানি পানের মাধ্যমে পরিবারের স্বাস্থ্য সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আগামী দিনের স্বপ্ন
সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো—হারুণ ও পলি দম্পতি ভবিষ্যতে হাঁস-মুরগি ও গরু পালনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ খামার গড়ে তুলতে চান। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করা এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অন্যদেরও স্বাবলম্বী করতে চান তারা।
তাদের বিশ্বাস—
“যেভাবে আমাদের জীবন আলোকিত হয়েছে, দাতা ও মাঠকর্মীদের জীবনও আল্লাহর রহমতে নিরাপদ ও আলোকিত থাকুক।”
আজ হারুণ–পলি দম্পতি শুধু একটি পরিবারের সাফল্যের গল্প নয়; তারা পুরো এলাকার দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জন্য একটি জীবন্ত রোল মডেল।
সবার প্রত্যাশা—এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ুক, যেন আর কোনো পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে না থাকে।



